দুর্জন মাঝির মৃত্যু ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন।

পুরুলিয়ার পাড়া অঞ্চলের বৃদ্ধ দুর্জন মাঝির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত রাজনীতি। তদন্তের আগেই রাজনৈতিক চাপানউতোর নিয়ে জনমনে বাড়ছে প্রশ্ন ও ক্ষোভ।

durjan majhi death purulia political controversy

পুরুলিয়ার পাড়া অঞ্চলের ৮২ বছর বয়সী আদিবাসী বৃদ্ধ দুর্জন মাঝির প্রয়াণ কেবল একটি শোকের সংবাদ হয়ে থাকেনি, বরং তা রাজ্য রাজনীতির এক অস্বস্তিকর দিককে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। 

একজন বয়োবৃদ্ধ মানুষের এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণ যখন এখনও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন, তখন সত্য উদঘাটনের চেয়ে রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতির অঙ্কই যেন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। 

ঘটনার পর ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট কিংবা পুলিশের কোনো চূড়ান্ত বয়ান আসার আগেই বিষয়টি নিয়ে শুরু হয়ে গেছে তীব্র রাজনৈতিক দড়িটান।

তদন্ত প্রক্রিয়ার কোনো উপসংহারে পৌঁছানোর আগেই দুর্জন মাঝির দেহ নিয়ে রাজপথে নেমেছে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। 

আনারা বাসস্ট্যান্ড চত্বরে মিছিল ও বিক্ষোভের মাধ্যমে সরাসরি আঙুল তোলা হয়েছে নির্বাচন কমিশনের দিকে। 

কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে কাঠগড়ায় তোলার এই প্রবণতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। 

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মৃত্যুর মতো একটি সংবেদনশীল ঘটনায় প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা। 

কিন্তু এখানে তদন্তের গতিপ্রকৃতি নির্ধারিত হওয়ার আগেই দায় চাপানোর এক তাড়াহুড়ো লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী বলেই মনে করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।

রাজনীতির এই মারপ্যাঁচে সাধারণ মানুষের মধ্যেও বাড়ছে বিরক্তি। অনেকের মতে, শোকপ্রকাশের একটি নিজস্ব শালীনতা থাকে, কিন্তু একজন প্রান্তিক বৃদ্ধের মৃত্যুকে হাতিয়ার করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা রাজনীতির মানকে ক্রমেই নিম্নমুখী করছে। 

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তড়িঘড়ি কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সামাজিকভাবে বিপজ্জনক। 

এতে একদিকে যেমন মৃত্যুর প্রকৃত কারণটি আড়ালে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়, তেমনি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থা শিথিল হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

দুর্জন মাঝির জীবন ছিল প্রান্তিক মানুষের লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি। তাঁর এই মৃত্যু সমাজ ও প্রশাসনের জন্য আত্মসমালোচনার সুযোগ হতে পারত। 

পরিবর্তে, লাশের ওপর দাঁড়িয়ে এই ক্ষমতার লড়াই গণতন্ত্রের জন্য কোনো শুভ বার্তা বয়ে আনছে না। 

এই তাড়াহুড়োর পেছনে নিছক ভোটের অঙ্ক নাকি জনরোষ অন্যখাতে ঘোরানোর কৌশল কাজ করছে, সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। 

শিক্ষিত সমাজ এই ধরনের ঘটনায় ক্ষুব্ধ, কারণ তাঁরা জানেন, রাজনীতির এই কদর্য খেলা শেষ পর্যন্ত সমাজকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। 

দুর্জন মাঝির মৃত্যু নিঃসন্দেহে শোকের, কিন্তু সেই শোককে ঘিরে যে অশালীনতা তৈরি হলো, তা সমকালীন রাজনীতির এক নির্মম ও কালো অধ্যায় হয়েই থেকে যাবে। 

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url