সরস্বতী পুজোর দিনে বিশ্বকর্মা আরাধনা।
ভাদ্র নয়, সরস্বতী পুজোর দিনেই বিশ্বকর্মা পুজো করেন পুরুলিয়ার ঝালদার শিল্পীরা। ২৬ বছরের পুরনো এই ব্যতিক্রমী রীতি ও তার পেছনের গল্প জানুন।
সরস্বতী পুজোর শুভ লগ্নে যখন গোটা বাংলা বাগদেবীর আরাধনায় মগ্ন, তখন পুরুলিয়ার ঝালদার আনন্দবাজারে দেখা গেল এক ভিন্ন ছবি।
সেখানে চিরাচরিত প্রথার বাইরে গিয়ে পালিত হলো দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার পুজো।
বাংলার ঘরে ঘরে যখন বিদ্যার দেবীর আরাধনা চলছে, তখন ঝালদার সূত্রধর বা কুম্ভকার সম্প্রদায়ের শিল্পীরা মেতে উঠলেন তাঁদের আরাধ্য দেবতার বন্দনায়।
সাধারণত ভাদ্র সংক্রান্তিতে বিশ্বকর্মা পুজো হওয়ার রীতি থাকলেও, এই এলাকার শিল্পীদের কাছে সরস্বতী পুজোর দিনটিই হলো বিশ্বকর্মা পুজোর প্রশস্ত সময়।
শতাব্দীপ্রাচীন এই পারিবারিক রীতির নেপথ্যে রয়েছে এক বিশেষ সামাজিক ও পেশাগত কারণ। আনন্দবাজারের সূত্রধর সম্প্রদায়ের শিল্পীরা মূলত মৃৎশিল্পী।
ভাদ্র মাসে যখন চারদিকে বিশ্বকর্মা পুজোর ধুম পড়ে, তখন এই শিল্পীরা মাটির মূর্তি তৈরির কাজে চূড়ান্ত ব্যস্ত থাকেন।
গ্রাহকদের বায়না সামলাতে গিয়ে নিজেদের আরাধ্য দেবতার আরাধনা করার ফুরসতটুকুও তাঁদের থাকে না।
তাই পূর্বপুরুষদের আমল থেকেই তাঁরা সরস্বতী পুজোর দিনটিকে বেছে নিয়েছেন বিশ্বকর্মা পুজোর জন্য।
তাঁদের মতে, এটি কোনো অসময়ের পুজো নয়, বরং কাজের চাপে যে দেবতাকে সময় দেওয়া যায়নি, তাঁকেই অবসর সময়ে ভক্তিভরে প্রণাম জানানো।
আনন্দবাজারের এই বিশ্বকর্মা মন্দিরে টানা ২৬ বছর ধরে এই বিশেষ পুজো হয়ে আসছে। স্থানীয় শিল্পীদের মতে, বিশ্বকর্মা হলেন তাঁদের কর্মের শক্তি।
সারা বছর যে যন্ত্র বা সরঞ্জামের সাহায্যে তাঁরা রুজি-রুটি জোগাড় করেন, সেগুলির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেই এই আয়োজন।
তিন দিন ধরে চলা এই উৎসবকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মানুষের মধ্যে উন্মাদনা থাকে চোখে পড়ার মতো। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে আশপাশের বহু মানুষ এই ব্যতিক্রমী পুজোয় শামিল হন।
একদিকে মণ্ডপে মণ্ডপে যখন সরস্বতী পুজোর মন্ত্র উচ্চারিত হয়, ঠিক তখনই এই মন্দির চত্বরে শোনা যায় বিশ্বকর্মার জয়ধ্বনি।
বর্তমানের ব্যস্ত যুগেও পূর্বপুরুষদের শেখানো সংস্কার এবং পারিবারিক ঐতিহ্যকে যেভাবে এই শিল্পীরা টিকিয়ে রেখেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।
তাঁদের এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, ভক্তি কেবল দিনক্ষণ বা পঞ্জিকার পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; ভক্তি হলো অন্তরের টান এবং পরম্পরার প্রতি অদম্য শ্রদ্ধা।
প্রচলিত নিয়মের উল্টো পথে হেঁটেও ঝালদার এই শিল্পীরা বুঝিয়ে দিয়েছেন, কর্মই ধর্ম এবং সেই কর্মের দেবতাকে স্মরণ করার জন্য মনের ভক্তিই যথেষ্ট।
