কাশ্মীরের দুর্ঘটনায় শহিদ পুরুলিয়ার জওয়ান প্রদুম্ন লোহারকে শেষ শ্রদ্ধা।
কাশ্মীরের ডোডায় সড়ক দুর্ঘটনায় শহিদ হলেন পুরুলিয়ার ঝালদার জওয়ান প্রদুম্ন লোহার। কফিনবন্দি দেহ গ্রামে ফিরতেই চোখের জলে শেষ বিদায় জানাল হাজার হাজার মানুষ।
দেশমাতৃকার টানে বাড়ি ছেড়েছিলেন যে তরুণ, তিনি ফিরলেন ঠিকই, কিন্তু নিথর দেহে।
গত বৃহস্পতিবার কাশ্মীরের ডোডা জেলায় এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ভারতীয় সেনাবাহিনীর দশজন বীর জওয়ান।
সেই দশজনের মধ্যেই ছিলেন পুরুলিয়া জেলার ঝালদা থানার অন্তর্গত পুস্তি গ্রামের ২৬ বছর বয়সী যুবক প্রদুম্ন লোহার।
শনিবার সকালে যখন তাঁর কফিনবন্দি দেহ গ্রামে পৌঁছায়, তখন গোটা এলাকা এক গভীর শোকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
পুস্তি হাই স্কুল প্রাঙ্গণে এদিন যেন তিল ধারণের জায়গা ছিল না। নিজের গ্রামের ভূমিপুত্রকে শেষবারের মতো এক ঝলক দেখতে এবং শ্রদ্ধা জানাতে মানুষের ঢল নামে।
উপস্থিত সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সহযোদ্ধা—সবার চোখেই ছিল জল, আর হৃদয়ে ছিল শহিদের প্রতি গভীর সম্মান।
ঝালদার এই শান্ত গ্রামটি এদিন তাঁর বীর সন্তানের বিয়োগে যেমন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, তেমনই গর্বিত ছিল তাঁর আত্মত্যাগে।
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, দুর্ঘটনার ঠিক আগের দিনও বাড়িতে ফোন করেছিলেন প্রদুম্ন। কথা ছিল, কাশ্মীরে ডিউটির মেয়াদ শেষ করে আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি ছুটি নিয়ে বাড়ি ফিরবেন তিনি।
প্রিয়জনের অপেক্ষায় দিন গুনছিল বাবা-মা। কিন্তু সেই আনন্দের খবর মুহূর্তেই বিষাদে পরিণত হয় যখন দুর্ঘটনার খবর পৌঁছায় গ্রামে।
৫ তারিখ তাঁর জীবিত ফেরার কথা থাকলেও, কয়েক দিন আগেই ফিরলেন তিরঙ্গায় মোড়া কফিনবন্দি অবস্থায়।
শহিদ জওয়ানকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এদিন উপস্থিত হয়েছিলেন পুরুলিয়ার সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো, বাঘমুন্ডির বিধায়ক সুশান্ত মাহাতো এবং জেলা কংগ্রেস সভাপতি নেপাল মাহাতো।
তাঁরা প্রত্যেকেই শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং এই কঠিন সময়ে তাঁদের পাশে থাকার পূর্ণ আশ্বাস দেন।
এলাকার জনপ্রতিনিধিরা জানান, শহিদ জওয়ানের স্মৃতি রক্ষার্থে গ্রামে স্থায়ী স্মারক নির্মাণ বা কোনো উন্নয়নমূলক কাজের উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে তাঁর সাহস ও ত্যাগের কথা আগামী প্রজন্ম মনে রাখে।
একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে গিয়েছেন বাবা রোমন লোহার। ভাঙা গলায় তিনি বলেন, “ছেলেটা দেশের জন্যই নিজের জীবন উৎসর্গ করল। ও আমাদের একমাত্র ভরসা ছিল। এখন সরকার যদি আমাদের মতো অসহায় বাবা-মায়ের পাশে থাকে, তবেই হয়তো আমরা বাকি জীবনটা কোনোমতে কাটাতে পারব।”
কাশ্মীরের দুর্গম পাহাড় থেকে পুরুলিয়ার লাল মাটিতে ফিরে আসা প্রদুম্ন লোহারের এই বিদায় কেবল একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, বরং গোটা জেলার জন্য এক অপূরণীয় শূন্যতা।
তবে তাঁর এই অকাল প্রয়াণ ঝালদার মানুষের হৃদয়ে দেশপ্রেম এবং অসীম সাহসের এক নতুন ইতিহাস লিখে দিয়ে গেল।
চোখের জল আর স্যালুটের মধ্য দিয়ে এদিন চিরবিদায় জানানো হলো বাংলার এই বীর সন্তানকে।
