বড়দিনেও ভিড়হীন অযোধ্যা পাহাড়।

২০২৫-এর বড়দিনে চেনা ছন্দে দেখা গেল না পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়কে। পর্যটক কম থাকায় ব্যবসায়ীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লেও খুশি পরিবেশপ্রেমীরা।  

ajodhya pahar

বড়দিন মানেই সাধারণত পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে উৎসবের মেজাজ, হোমস্টের বারান্দায় আড্ডা আর পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়। কিন্তু ২০২৫ সালের চিত্রটা পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ে সম্পূর্ণ আলাদা। 

প্রতি বছর ২৫শে ডিসেম্বর যে চেনা কোলাহল আর যানজট দেখা যায়, এবার তা ছিল কার্যত অনুপস্থিত। 

পর্যটক এলেও সেই উৎসবের উত্তাপ যেন কোথাও একটা ফিকে হয়ে গেছে। দিনভর পাহাড় জুড়ে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা লক্ষ্য করা গেল।

সকাল থেকে দু-একটি পর্যটকবাহী গাড়ি পাহাড়ে উঠতে দেখা গেলেও, আগের বছরগুলোর মতো দীর্ঘ লাইন নজরে পড়েনি। 

বনবাংলো চত্বর থেকে শুরু করে জনপ্রিয় ভিউ পয়েন্ট বা ট্রেকিং রুট—সব জায়গাই ছিল বেশ ফাঁকা। 

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, গত কয়েক বছর এই দিনে পাহাড়ে হাঁটাচলা করা দায় হয়ে উঠত, সেখানে এবারের পরিবেশ ছিল অনেক বেশি শান্ত ও স্বস্তিদায়ক। 

হোটেল ও হোমস্টে মালিকদের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে এক হতাশাজনক ছবি। তাঁরা জানাচ্ছেন, আগে থেকে বুকিং থাকলেও শেষ মুহূর্তে অনেকেই তা বাতিল করেছেন। 

আবার যারা এসেছেন, তারা দীর্ঘ সময় না থেকে একদিনের মধ্যেই ফিরে গিয়েছেন।

পর্যটন ব্যবসায়ীদের মতে, এই মন্দার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। প্রথমত, আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ভ্রমণের বাজেটে টান ফেলেছে। 

যাতায়াত এবং থাকা-খাওয়ার খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই এবার হাত গুটিয়ে নিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিনের অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। 

সরাসরি ট্রেন বা পর্যাপ্ত বাস পরিষেবার অভাব এখনও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর পাশাপাশি প্রশাসনের কড়াকড়িকেও বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। 

বনাঞ্চলে শব্দদূষণ রোধে মাইক বাজানো বা চড়ুইভাতির ওপর বিধিনিষেধ থাকায় অনেক 'পিকনিক পার্টি' এবার অযোধ্যা এড়িয়ে অন্য গন্তব্য বেছে নিয়েছেন।

তবে পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে আরও একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক কারণ আছে। অযোধ্যা পাহাড়ের পর্যটন মূলত কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর ওপর নির্ভরশীল। 

একই জায়গায় বারবার আসার ফলে অনেক পর্যটকের কাছেই এই গন্তব্য এখন একঘেয়ে হয়ে পড়েছে। 

নতুন কোনো আকর্ষণ বা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার অভাব থাকলে পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নেবেন—এটাই স্বাভাবিক। 

অনেকেই এর সাথে ঘাটশিলার তুলনা টানছেন। একসময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় ঘাটশিলা যেমন পরিকাঠামো ও পরিকল্পনার অভাবে গুরুত্ব হারিয়েছে, অযোধ্যা পাহাড়ও কি সেই পথেই এগোচ্ছে? এই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

যদিও পরিবেশপ্রেমীরা এই নির্জনতাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। তাঁদের মতে, অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণ পাহাড়ের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করে। 

নিয়ন্ত্রিত পর্যটনই পাহাড়ের স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখতে সাহায্য করবে। সব মিলিয়ে এবারের বড়দিন অযোধ্যা পাহাড়ের সামনে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। 

একদিকে স্থানীয় অর্থনীতির প্রয়োজনে পর্যটনকে চাঙ্গা করার তাগিদ, অন্যদিকে প্রকৃতির শান্ত রূপ রক্ষা করার দায়—এই দুইয়ের দোলাচলেই কাটল ২০২৫-এর বড়দিন।

Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url